বাগেরহাট জেলায় এক সঙ্গে দুইটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ রয়েছে যা পৃথিবীর কোথাও নেই। এখানে রয়েছে অসংখ্য পুরাকীর্তি আর ঘন শ্যামল বনানী। পীর খানজাহানের স্মৃতি বিজড়িত সাগর কন্যা সুন্দরবনের আঁচলে ঢাকা বাগেরহাট পযর্টকদের জন্য অন্যতম আর্কষণীয় স্থান।

বাগেরহাট জেলা এক নজরে

বাগেরহাট জেলার মোট আয়তন ৫৮৮২.১৮ বর্গ কিলোমিটার (১,৮৩৪.৭৪ বর্গকিঃমিঃ বনাঞ্চলসহ), লোকসংখ্যা ১৪,৭৬,০৯০ জন (২০১১ এর আদমশুমারী অনুযায়ী), পুরুষ ৭,৪০,১৩৮ জন, মহিলা ৭,৩৫,৯৫২ জন, উপজেলা ০৯ (নয়)টি, ইউনিয়ন ৭৫ (পঁচাত্তর) টি, গ্রামেরসংখ্যা ১,০৪৭ টি, মৌজারসংখ্যা ৭২০ টি, পৌরসভা ০৩ টি (বাগেরহাট, মোংলাপোর্ট, মোড়েলগঞ্জ, যথাক্রমে ক,খ,গ শ্রেণী), নদ-নদী ৩২টি, খাল ৫৪৭টি, বিল ৩২টি, মসজিদ ২৫১৪টি, মন্দির ৬৯৪টি, গীর্জা ১৮টি, বনাঞ্চল (সুন্দরবন) ১,৮৬৮.৯১ বর্গকিঃমিঃ, সমুদ্রবন্দর ০১টি (মংলাসমুদ্রবন্দর) ,ইপিজেড১টি(মোংলাইপিজেড)।

জেলার পটভূমি

বাগেরহাটের নাম কে করে দিয়েছিলেন তা গবেষণা সাপেক্ষ হলেও আজ তা নিরূপন করা দুঃসাধ্য। কারো কারো মতে বাগেরহাটের নিকটবর্তী সুন্দরবন থাকায় এলাকাটিতে বাঘের উপদ্রব ছিল, এ জন্যে এ এলাকার নাম হয়ত ‘‘বাঘেরহাট’’ হয়েছিল এবং ক্রমান্বয়ে তা বাগেরহাট-এ রূপান্তরিত হয়েছে। মতান্তরে হযরত খানজাহান(রঃ) এর প্রতিষ্ঠিত ‘‘খলিফাত-ই-আবাদ’’ এর বিখ্যাত ‘‘বাগ’’ অর্থ বাগান, এ অঞ্চলে এতই সমৃদ্ধি লাভ করে যে, তা থেকেই হয়ে দাঁড়িয়েছে বাগের আবাদ তথা ‘‘ বাগেরহাট’’ । তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হচ্ছে শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদীর উত্তর দিকের হাড়িখালী থেকে বর্তমান নাগের বাজার পর্যমত্ম যে লম্বা বাঁক অবস্থিত, পূর্বে সে বাঁকের পুরাতন বাজার এলাকায় একটি হাট বসত। আর এ হাটের নামে এ স্থানটির নাম হলো বাঁকেরহাট। কালক্রমে বাঁকেরহাট পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে বাগেরহাট নামে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে বাগেরহাট জেলার অবস্থান। বাগেরহাট খুব পুরনো ভূখন্ড না হলেও বাগেরহাটের সমৃদ্ধির ইতিহাস উপমহাদেশের বহু প্রাচীন জনপদের সমকালীন ও সমপর্যায়ের। হযরত খানজাহান(রঃ) এর সময় এ অঞ্চলের দীঘি খননকালে বিশেষ করে ‘‘ খাঞ্জেলী দীঘি’’ খননকালে পাওয়া ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি থেকে অনুমিত হয় হযরত খানজাহান(রঃ) এর আগমনের বহুপূর্ব হতেই বাগেরহাটে এক বিসত্মৃত জনপদ ছিল। বর্তমানে সেই বুদ্ধমূর্তি বাগেরহাটের শিববাড়ি থেকে স্থানামতরিত হয়ে ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধ বিহারে রক্ষিত আছে। বাংলার শাসক যখন নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ(১৪৪২-১৪৫৯) তখন হযরত খানজাহান(রঃ) এ অঞ্চল আবাদ করে নামকরণ করলেন ‘‘ খলিফাত-ই-আবাদ’’ বা প্রতিনিধির অঞ্চল। মানুষের কল্যাণে তিনি তৈরী করলেন ষাটগম্বুজসহ অসংখ্য মসজিদ, দীঘি, রাসত্মা ও পত্তন করলেন অগণিত হাট-বাজার। হযরত খানজাহান(রঃ) এর আগমনকাল না জানা গেলেও এ সাধক পুরম্নষ পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বহু ধর্মপ্রাণ অনুসারিদের সাথে নিয়ে যশোর জেলার বার বাজার হয়ে ভৈরব নদী অতিক্রম করে বাগেরহাট পৌঁছান। তাঁর মাজারগাত্রে উৎকীর্ণ শীলালিপি হতে জানা যায় ২৬ জিলহজ্ব ৮৬৩ হিজরী(১৪৫৯ খ্রিঃ) তে তিনি ইমেত্মকাল করেন। হযরত খানজাহান(রঃ) এর তিরোধানের পর হুসাইন শাহীর বংশধরেরা এ অঞ্চল শাসন করতেন। বঙ্গেশ্বর নসরৎ শাহের খলিফাতাবাদটাকশাল বাগেরহাট শহরের সম্ভবতঃ মিঠাপুকুরের নিকটে অবস্থিত ছিল। মিঠাপুকুর পাড়ে সে আমলের একটি মসজিদ আছে। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সময়ে নির্মিত এক আকর্ষণীয় মঠ যাত্রাপুরের অযোধ্যায়(কোদলা) অবস্থিত। আজকের বাগেরহাট সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে বয়ে বেড়াচ্ছে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা বাগেরহাট বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও সুন্দরবন অঞ্চলে দূর্ভেদ্য ঘাঁটি এক অনন্য দৃষ্টামত্ম স্থাপন করে। ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিসের শাসন আমলে যশোরকে জেলায় পরিণত করা হয়। ১৮৪২ সালে খুলনা যখন যশোর জেলার একটি মহকুমা তখন বাগেরহাট খুলনার অমত্মর্গত একটি থানা। ১৮৪৯ সালে মোড়েল উপাধিধারী দু’জন ইংরেজ বাগেরহাটে মোড়েলগঞ্জ নামক একটি বন্দর স্থাপন করেন। ১৮৬১ সালের ২৬ নভেম্বর ‘‘মোড়েল-রহিমুলস্নাহ’’ নামে খ্যাত এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, তখন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র খুলনার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। সেই সংঘর্ষের তদমত্ম তিনিই করেন এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনে বাগেরহাটে একটি মহকুমা স্থাপন করার সুপারিশ করেন। ফলশ্রুতিতে ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট মহকুমা হিসেবে যশোর জেলার অমত্মর্গত হয়। ১৮৮২ সালে খুলনা, সাতক্ষিরা ও বাগেরহাট মহকুমা নিয়ে খুলনা জেলা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রম্নয়ারি বাগেরহাট মহকুমা জেলায় উন্নীত হয়। বর্তমানে বাগেরহাট ০৯টি উপজেলা,৭৫টি ইউনিয়ন,১০৪৭ টি গ্রাম এবং ০৩ টি পৌরসভার সমন্বয়ে গঠিত একটি ’’এ’’ ক্যাটাগরীভূক্ত জেলা।

 

উপজেলার তালিকা

ক্রমিক নং

উপজেলার নাম

বাগেরহাট সদর

(Bagerhat Sadar)

ফকিরহাট (Fakirhat)

মোল্লাহাট (Mollahat)

কচুয়া(Kachua)

চিতলমারী(Chitalmari)

রামপাল (Rampal)

মোংলা (Mongla)

মোড়েলগঞ্জ (Morrelganj)

শরণখোলা (Sarankhola)

 





বাগেরহাট জেলার মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার তালিকা

বিংশ শতাব্দিতে বাঙালীর শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলার স্বাধীনতা। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জাতির অহংকার ও গর্বের বিষয়। দীর্ঘ নয় মাস পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এদেশের বীর বাঙালী যুদ্ধ করে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলো। ২৪ বছরের পাকিস্তানী দুঃশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিলো। ১৯৪৭ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ করে বৃটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে যায়। জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দু’টি প্রদেশে বিভক্ত ছিলো। পূর্ব পাকিস্তানে বহু ধর্মের মানুষ বাস করলেও তাদের ভাষা ছিলো বাংলা। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানী শাসকরা রাষ্ট্র ভাষা উর্দু করার ঘোষণা দেওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীরা তা মেনে নিতে পারেনি। প্রতিবাদে ঝলসে ওঠে বাঙালী । সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিকের রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্র ভাষা বাংলাকে ছিনিয়ে আনা হয়। ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন -প্রথম জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারী করা হয়, ১৯৬২ সালের কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক ছাত্র জনতার গণ অভ্যূত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। প্রত্যাহার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ১৯৭০ এর নির্বাচনে এদেশের জনগণের ৬ দফার পক্ষে ম্যান্ডেন্ট প্রদান। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করার পর ক্ষমতা হস্তান্তর পাক সামরিক শাসকদের ছলচাতুরী -এদেশের মানুষকে বাধ্য করেছিলো পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে যেতে। দীর্ঘ ২৪ বছর এই আন্দোলন সংগ্রামে বাঙালী জাতিকে অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে অনেক জাতীয় নেতাদের । এসব নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মাওলানা ভাসানীর নাম উল্লেখযোগ্য। জাতি বঙ্গবন্ধুকে ৭০-এর নির্বাচনে ম্যান্ডেট নিয়েছিলো দেশ পরিচালনার জন্য। ৭ই মার্চ ১৯৭১ এ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে ঘোষণা করেন ‘‘ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ’’ এবং যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার আহবান জানান। ২১ বছর স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুদের মাধ্যমে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে এদেশে পরিচালিত হয়েছে। সে কারণেই স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ আজ ভুলুন্ঠিত। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ যা ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিলো। এই রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিই ছিলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে যারা হত্যা করে ক্ষমতায় বসেছিলেন, তারা সংবিধান থেকে এগুলি মুছে দেন। ­­­­জাতীয় বীরদের সঠিক মর্যাদা ও সম্মান দিতে না পারলে জাতির ইতিহাস ও অগ্রগতি থমকে যাবে। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের সকলের। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে প্রতিটি বাঙালির। ৩০ লক্ষ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে আমাদের সকলকে। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্থান চিহ্নিত করে স্মারকস্তম্ভ বা ভাস্কর্য স্থাপন করে সেই যুদ্ধে শহীদদের তালিকা প্রস্তরফলকে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে হবে। আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য একাজগুলি করা অত্যন্ত জরুরী।
আরও

মেনু

জেলা ভ্রমণ তথ্য

আমাদের ঠিকানা

দত্তপারা চৌরাস্তা, খাগান, আশুলিয়া
সাভার, ঢাকা

+৮৮০ ১৬ ৪৮ ১৪৪ ৫৫৪

শনি-বৃহস্পতি, সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা

kazi35-164@diu.edu.bd

মেইল

আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

আপনার ভ্রমণ হোক আনন্দময়